হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হযরত খাদিজার (সা.আ.) স্বপ্ন ও বিবাহ
রাসূলের (সা.) সাথে পরিচয় হওয়ার পূর্বে তিনি এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের কথা তার চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফলের কাছে বর্ণনা করেন। তার স্বপ্নটি ছিল এ রকম যে, আকাশ হতে আমার কোলে একটি চাঁদ নেমে আসল এবং সেটা আবার সাত ভাগে বিভক্ত হল।
ওরাকা বিন নওফেল বলল: এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা হল শেষ যুগে এক রাসূলের আবির্ভাব ঘটবে এবং তার সাথে তোমার বিবাহ হবে। আর সেই বিবাহের ফলে তোমাদের থেকে সাতটি সন্তান জন্ম নিবে।
হযরত খাদিজার (সা.) সাথে হযরত মুহাম্মদের (সা.) সাক্ষাত ও বিবাহের প্রস্তাব
হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন ব্যবসার কাজে মক্কা থেকে শামে (সিরিয়া) গিয়েছিলেন, তখন খাদিজার সাথে তাঁর পরিচয় হয়েছিল এবং তাঁর সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের কাজ শুরু করেন। খাদিজা (সা.) হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আখলাক ও চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর স্বপ্নের সাথে সব মিলে যাচ্ছিল। খাদিজা মুহাম্মদ (সা.) কে ডাকলেন এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই প্রস্তাবে একটু চিন্তিত হলেন। কারণ, হযরত খাদিজা ছিলেন ধনী এবং তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষ তেমন ধন-সম্পদ ছিল না। হযরত মুহাম্মদ (সা.) খাদিজার প্রস্তাবের কথা তাঁর চাচা আবু তালেবকে বললেন। আবু তালেব এই প্রস্তাবের কথা অত্যন্ত খুশি হলেন এবং রাজী হলেন। হযরত খাদিজা ও মুহাম্মদ (সা.) এর বিয়ে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করলেন। খাদিজার নিবিড় ভালবাসাকে মুহাম্মদ (সা.) উপলগ্ধি করেছিলেন এবং তিনি হৃদয়ে উপলগ্ধি করলেন যে, আকাশ থেকে শব্দ এলো ও বলল: "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র নারীকে পবিত্র ও সত্যবাদী স্বামী দান করে থাকেন।" তখন তাদের চোখের সামনে থেকে পর্দা সড়ে যায় এবং বেহেস্তের হুরগুলো যে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল তা অবলোকন হয় এবং আতরের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর সবাই বলতে থাকে যে, এত সুন্দর সুগন্ধ এই সততা থেকেই উৎসারিত হয়েছে।
অভিযোগকারী নারীদের প্রতি হযরত খাদিজার (সা.) উপযুক্ত জবাব
কুরাইশ বংশের একদল ত্রুটি অন্বেষকারী মূর্খ নারী হযরত খাদিজা (সা.) সম্পর্কে অভিযোগ ও উপহাস করতে লাগল। তারা উপহাস করে বলতো:
"খাদিজার মত একজন প্রসিদ্ধ ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী বিত্তশালী নারীর এটা মানায় না যে একজন ইয়াতীম, রিক্তহস্ত, দরিদ্র ব্যক্তিকে বিয়ে করবে আর এটা কি নেক্কারজনক একটা বিষয় নয়?।"
যখন এই কথাটি হযরত খাদিজার (সা.) কানে পৌঁছালো তিনি তার কর্মচারীদেরকে সুস্বাদু খাবার তৈরীর নির্দেশ দিলেন। আর ঐ সকল নারীদেরকে দাওয়াত করলেন। যখন সবাই আহারে ব্যস্ত তখন হযরত খাদিজা (সা.) তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:
"হে নারী সমাজ! তোমরা নাকি হযরত মুহাম্মদকে (সা.) বিয়ে করার বিষয়কে কেন্দ্র করে আমাকে উপহাস করছো। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাই:
"হযরত মুহাম্মদের (সা.) মত ঐ ধরনের ভাল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি কি তোমাদের নজরে আছে? মক্কা ও মদীনার আশে পাশে এমন ব্যক্তিত্ববান কেউ কি আছে যিনি হযরত মুহাম্মদের (সা.) মত চরিত্র ও মর্যাদার দিক থেকে এত সৌন্দর্য্যপূর্ণ এবং পরিপূর্ণতার অধিকারী? আমি তার এই পূর্ণতার কারণেই তাকে বিবাহ করেছি, আর এমন কিছু তার সম্পর্কে শুনেছি ও দেখেছি যা অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। সুতরাং এটা উচিত নয় যে, তোমরা যা খুশি তাই বলবে ও অজ্ঞতাবশে কাউকে অশোভনীয় অপবাদ দিবে।"
হযরত খাদিজার (সা.) এ ধরনের হৃদয়গ্রাহী কথা শুনে সমস্ত নারীরা নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাদের এই নিস্তব্ধতা তারই সাক্ষ্য বহন করে যে, এ সম্পর্কে তাদের আর বলার মত কোন ভাষা নেই। হযরত খাদিজা (সা.) এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তার সাথে ও আল্লাহর সন্তুষ্টচিত্তে তাদের কৃতকর্মের জবাব দিয়েছিলেন।
হযরত আদমের (আ.) বাণীতে হযরত খাদিজার (সা.) কৃতিত্বের কথা
হযরত খাদিজার (সা.) কৃতিত্ব বা মর্যাদার কথা বিশ্বের প্রথম মানব হযরত আদমের (আ.) সময় অর্থাৎ হযরত খাদিজার (সা.) জন্মেরও বহু শতাব্দী পূর্বে আলোচিত একটি বিষয় ছিল (হযরত আদম (আ.) হতে বর্ণিত) তিনি বলেছেন: কিয়ামতের দিন আমি সকল মানবজাতির সর্দার ও নেতা, কিন্তু এমন এক ব্যক্তি আসবে যিনি আমারই সন্তানগণের মধ্য থেকে আর তিনি রাসূলগণের মধ্যেও একজন রাসূল যার নাম মুহাম্মদ তিনি দু'দিক থেকে আমার চেয়েও বেশী মর্যাদার অধিকারী:
তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে যিনি ছিলেন তার সর্বোত্তম সঙ্গী কিন্তু আমার স্ত্রী হাওয়া সে ধরনের ছিল না।
তিনি পরিপূর্ণভাবে অশুভ আত্মার উপর কর্তৃত্বের অধিকারী (এমন কি তারকে আউলা পর্যন্ত আঞ্জাম দেন নি) কিন্তু আমি ঐ রকম নই।
স্বামীর প্রতি হযরত খাদিজার (সা.) সহমর্মীতা
রাসূল (সা.) নবুয়্যত ঘোষণার প্রাক্কালে এক সাড়া জাগানো স্বপ্ন দেখেছিলেন ও খাদিজার (সা.) নিকট এসে এভাবে বর্ণনা করলেন: আমি স্বপ্নে দেখলাম আমার পেটের ভুরিকে স্বস্থান হতে সরে আনা হয়েছে। অতঃপর সেটাকে ধৌত ও পবিত্র করা হয়েছে এবং আবার সেটাকে স্বস্থানে রাখা হয়েছে।
হযরত খাদিজা (সা.) রাসূলের (সা.) স্বপ্নের কথা শুনে বললেন: "আপনার এই স্বপ্ন অতি উত্তম ও সৌভাগ্যের চিহ্ন বহন করে, আপনাকে সম্ভাষণ জানায়, আল্লাহ আপনার প্রতি কল্যাণ ব্যতীত কিছু করেন না।"
হযরত খাদিজা (সা.) এরূপ পরিস্থিতেও রাসূলের (সা.) সহচর, বন্ধু, বিশ্বস্ত সাথী ও দূর্দিনে সহমর্মী ছিলেন। যে কোন দূর্ঘটনা যেটা রাসূলের (সা.) অশান্তি বা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতো, আল্লাহ তায়ালা হযরত খাদিজার (সা.) মাধ্যমে সেই অশান্তি বা দুশ্চিন্তা দূর করে দিতেন এবং হযরত খাদিজাও (সা.) তাঁর কষ্ট দূর করে দিয়ে তাঁকে প্রশান্তি দান করতেন। হযরত খাদিজার (সা.) এই কর্মসূচীটি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
ইসলামের অগ্রগতির ক্ষেত্রে হযরত খাদিজার (সা.) ধন-সম্পদের ভূমিকা
ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, হযরত খাদিজা (সা.) রাসূলের (সা.) সাথে পরিণয় হওয়ার পূর্বেও আরবদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ধণাঢ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার প্রায় সত্তর হাজার উট ছিল ও বাণিজ্য কাফেলাগুলি দিবা-রাত্রি তায়েফে, ইয়েমেনে, শামে (সিরিয়ায়), মিশরে এবং অন্যান্য রাষ্ট্রে বাণিজ্যিক লেন-দেন করতো, তার অনেকগুলি ক্রীতদাস ছিল যারা তার ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল।
হযরত খাদিজার (সা.) বিস্ময়কর আত্মত্যাগসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে রাসূলের (সা.) সাথে বিবাহের পর ইসলাম পূর্ব ও ইসলাম পরবর্তী যত সম্পদ ছিল সমস্ত সম্পদ রাসূলের (সা.) অধীনে দিয়ে দিয়েছিলেন যাতে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে তিনি সেগুলিকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে পারেন।
এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে, রাসূল (সা.) দরিদ্র অবস্থা থেকে সম্পদশালী অবস্থাতে রূপান্তরিত হলেন এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনূগ্রহের অবদান সম্পর্কে রাসূলকে (সা.) উদ্দেশ্য করে বলতে গিয়ে এভাবে আয়াত অবর্তীর্ণ করেন:
আল্লাহ আপনাকে অভাবী অবস্থায় পেয়েছেন অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন।
বর্ণনানুসারে অর্থাৎ হযরত খাদিজার (সা.) সম্পদের মাধ্যমে আপনাকে অমুখাপেক্ষী করেছেন।
হযরত খাদিজার (সা.) ধন-সম্পদের ব্যয়ক্ষেত্র
রাসূল (সা.) বলেছেন: "দুনিয়ার কোন ধন-সম্পদই আমাকে এতটা লাভবান করেনি যতটা খাদিজার সম্পদ করেছে।" এমতাবস্থায় এ প্রশ্ন মনে ভেসে উঠতে পারে যে, রাসূল (সা.) খাদিজার (সা.) এই অঢেল সম্পদকে কোন পথে কিভাবে ব্যয় করলেন?
এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে রাসূল (সা.) খাদিজার (সা.) সম্পদ হতে ঋণগ্রস্থদের ঋণমুক্ত করার কাজে, রিক্তহস্তদেরকে সাহায্যের কাজে, ইয়াতীমদের প্রতিপালনের কাজে, মুসলমানরা যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করত, মুশরিকরা তাদের মাল-সম্পদকে লুট করত, রাসূল (সা.) তাদেরকে খাদিজার (সা.) সম্পদ থেকে সাহায্য করতেন যাতে তারা মদীনায় পৌঁছতে পারে। এক কথায়, রাসূল (সা.) যেভাবে ভাল মনে করতেন সেভাবে হযরত খাদিজার (সা.) সম্পদকে ব্যয় করতেন।
রাসূল (সা.) সর্বদা হযরত খাদিজাকে (সা.) স্মরণ করতেন
যদিও পরবর্তীতে উল্লেখ করা হবে যে, হযরত খাদিজা (সা.) নবুয়্যত ঘোষণার দশ বছর পর ইন্তেকাল করেছেন, রাসূল (সা.) তার ইন্তেকালের দশ বছর অথবা তার কিছু বেশী দিন যাবৎ জীবিত ছিলেন। এই সময়গুলিতে তিনি (সা.) সারাক্ষণ হযরত খাদিজাকে (সা.) স্মরণ করতেন, তার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করতেন। কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে, তিনি হযরত খাদিজার (সা.) কথা স্মরণ করে এমনভাবে ক্রন্দন করতেন যে তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়তো। কারণ, রাসূল (সা.) হযরত খাদিজার (সা.) গভীর ভালবাসা ও দয়ার ঝর্ণাধারাকে অবলোকন করেছিলেন। হযরত খাদিজার (সা.) প্রতি রাসূলের (সা.) এই ধরনের আচরনের কথা ঐতিহাসিকভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করবো:
একদিন রাসূল (সা.) তাঁর কয়েকজন সহধর্মিনীর সাথে ছিলেন হঠাৎ করে হযরত খাদিজার (সা.) প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হল, রাসূল (সা.) এত বেশী স্পর্শকাতর হয়ে উঠলেন যে, তাঁর দু'চোখ থেকে অশ্রু ঝড়তে লাগলো।
হযরত আয়েশা তাঁকে বললেন: "আপনি কাঁদছেন কেন? একজন বয়োঃবৃদ্ধ মহিলার জন্য এভাবে কাঁদতে হবে?" রাসূল (সা.) প্রতিত্তোরে বললেন:
যে সময় তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলতে সে সময় সে আমাকে সত্যবাদী হিসেবে মেনে নিয়েছিল ও যে সময় তোমরা কাফির ছিলে সে সময় সে আমার প্রতি ঈমান এনেছিল, সে আমাকে সন্তান দান করেছে আর তোমরা তো বন্ধ্যা।
হাসান রেজা
আপনার কমেন্ট